A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site
Home / News / কথা বেশি, কাজ কম

কথা বেশি, কাজ কম

• অতীতে সিদ্ধান্তের কমতি নেই
• সুপারিশও হয়েছে অনেক
• উচ্চপর্যায়ের মনোযোগে কমতি নেই
• বাস্তবায়নেই মূল সমস্যা

সড়কে শৃঙ্খলা আসেনি বলে স্বীকার করে নিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ জন্য সড়কে দুর্ঘটনা ও যানজট হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। মন্ত্রী মনে করেন, মহাসড়কে ধীরগতির অবৈধ যে যানবাহন চলছে, এর পেছনে রাজনৈতিক নেতাদের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা আছে।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ওবায়দুল কাদের। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য এই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।

এর আগেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি বলে একাধিকবার আক্ষেপ করেছেন সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান সড়কমন্ত্রী নিজে। এর বাইরে সড়কে শৃঙ্খলায় পরামর্শ দেওয়ার জন্য রয়েছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরিষদ। এটিরও প্রধান সড়কমন্ত্রী। তিনি প্রায় আট বছর ধরে সড়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন।

গত ডিসেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৬ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ২৪ হাজার ৯৫৪ জন প্রাণ হারান।

সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজনে টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। অবশ্য এর আগেও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাজধানী থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন তুলে দেওয়ার জন্য টাস্কফোর্স হয়েছিল। বাস-মিনিবাসের ‘সিটিং সার্ভিস’ থাকবে কি না, এটা নিয়েও কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এসব টাস্কফোর্স ও কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।

গত বছর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরু হলে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যে সড়ক পরিবহন আইন পাস করা হয়। এখনো এই আইন কার্যকর করতে পারেনি সড়ক মন্ত্রণালয়। এই আইনের বিরুদ্ধে গত অক্টোবরে টানা ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘট পালন করে মালিক–শ্রমিক সংগঠন।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের আন্দোলনের ভয়েই নতুন আইন বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। আর ধীরগতির অবৈধ যানবাহন চলাচলের পেছনে স্থানীয় রাজনীতিকদের প্রভাব থাকার বিষয়টি সত্য। তবে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের পরিবহনব্যবস্থাই সরকারদলীয় রাজনীতিকদের কবজায়। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনেও রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই বলেছি, সড়কে শৃঙ্খলা আসেনি। অবকাঠামোগত প্রকল্পে যত অগ্রগতি, সেই তুলনায় সড়ক ও পরিবহনে শৃঙ্খলাটা অতটা হয়নি, যার জন্য সড়ক দুর্ঘটনা বা যানজট রয়েছে। আইন অমান্য করে ধীরগতির বাহন মহাসড়কে এখনো চলাচল করে, যা দূরপাল্লার বড় গাড়িগুলোর চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। অবৈধ যানবাহন চলাচলে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতাও আছে।’

সারা দেশের পরিবহনমালিকদের সংগঠনের সভাপতি সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান। এই সংগঠনের মহাসচিব ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। পরিবহনশ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি হলেন সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংসদ শাজাহান খান। ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাস কোম্পানির বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

মানুষ বাঁচাতে হবে

মন্ত্রী বলেন, বড় যানবাহনের সঙ্গে সিএনজি বা ইজিবাইকের যদি সংঘাত হয়, আর ইজিবাইকে যদি ১০ জন থাকে, ১০ জনই মারা যায়। বড় বড় গাড়িতে সংঘাত হলে আহত হয়, এ রকম নিহত হয় না। ছোট ছোট যান নিয়ন্ত্রণ করা তাঁদের প্রথম দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘ইজিবাইক-নছিমন-করিমনের সঙ্গে অনেকে জড়িত, এখানে রাজনৈতিক বিষয়ও আছে । তবে মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে আগে।’ যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, কেন করা যাবে না প্রশ্ন তুলে মন্ত্রী বলেন, তা করতে হবে।

২০১১ সালে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে ইজিবাইক আমদানি নিষিদ্ধ করে সরকার। নতুন করে কোনো ইজিবাইক আমদানি, নিবন্ধন দেওয়া ও স্থানীয়ভাবে তৈরির অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এমনকি বুয়েটের পরামর্শ নিয়ে ইতিমধ্যে নিবন্ধন দেওয়া ইজিবাইকগুলো কত দিন চলতে পারবে, এর একটা সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। শুরুতে ইজিবাইকগুলো সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। বিআরটিএ এগুলোর নিবন্ধন দেয়নি। অন্যদিকে নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ নানা নামে চলাচলকারী গ্রামীণ হিউম্যান হলারের কারিগরি মান নিয়ে সন্দেহ থাকায় এগুলোর নিবন্ধন দেয় না বিআরটিএ। সিএনজি ও ডিজেলচালিত অটোরিকশা ও টেম্পোর নিবন্ধন দেয় বিআরটিএ। ২০১৫ সালে এগুলোর মহাসড়কে চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। অনিবন্ধিত ও নিবন্ধিত মিলে সারা দেশে ১০ লাখের ওপর ছোট যান রয়েছে বলে মনে করে বিআরটিএ। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তই কার্যকর করতে পারেনি সরকার।

মহাসড়কে একের পর এক দুর্ঘটনাকে এখন সবচেয়ে বড় দুর্ভাবনার বিষয় উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, শিগগিরই সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভা ডাকা হবে। কমিটি সাজানো হবে নতুন করে। নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভায় সড়ক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি করে দেওয়া হবে। তাদের কাছ থেকে অল্প দিনের ব্যবধানে প্রতিবেদন চাওয়া হবে। পরে যদি টাস্কফোর্স করতে হয়, তা–ও করা হবে। মন্ত্রী বলেন, ‘এটার (সড়ক দুর্ঘটনা) লাগাম টেনে ধরতে হবে, রাশ টেনে ধরতে হবে। জাতীয় স্বার্থে এবং জাতির দুর্ভাবনা অবসানের স্বার্থে। কারণ, সড়ক দুর্ঘটনা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাবনা, এটা অস্বীকার করে লাভ নেই।’

কথা বেশি, কাজ কম

২০১১ সালে সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সুপারিশ তৈরির জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের কমিটিতে বুয়েটের শিক্ষক, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও মালিক-শ্রমিক নেতারা ছিলেন।

২০১২ সালের মাঝামাঝি কমিটির সদস্যরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে প্রায় ৭৮টি সুপারিশ করেন। এর মধ্যে ৫২টিই স্বল্পমেয়াদি। সুপারিশের মধ্যে ছিল মহাসড়কে অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি ও ইজিবাইক চলাচল বন্ধ করা; দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই করে যথাযথ আইন মেনে লাইসেন্স দেওয়া; পরিবহনচালকদের নিয়োগপত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করা; সড়কে যথাযথ সংকেত স্থাপন করা; মহাসড়কে হাটবাজার স্থাপন নিষিদ্ধ করা; পর্যায়ক্রমে সব সড়ক-মহাসড়কে সড়ক বিভাজক দেওয়া; সড়ক দুর্ঘটনার একটি মামলা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিচালনা করে এর রায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সূত্র বলছে, দেশের ৬২ শতাংশ জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে যথাযথ সাইন-সংকেত নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সূত্র বলছে, চালকের ঘাটতি ১৮ লাখ। তাঁদের নিয়োগপত্র দেওয়া হচ্ছে না। মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলছে।

২০১৪ সালে রাজধানী ঢাকা থেকে লক্কড়ঝক্কড় বাস-মিনিবাস উঠিয়ে দিতে বিআরটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যানকে প্রধান করে ১১ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। বিআরটিএ সূত্র বলছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি।

২০১৫ সালে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের এক বৈঠকে দুর্ঘটনা কমাতে মহাসড়কের সর্বোচ্চ গতিবেগ ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করার কথা জানিয়েছিলেন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ২০০৯ সালে প্রতিটি যানবাহনে নির্দিষ্ট গতিসীমা মেনে চলার যন্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। এসব সিদ্ধান্ত বা আদেশ আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

২০১৭ সালে ঢাকার গণপরিবহনে ‘সিটিং সার্ভিস’ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) মাহবুব-ই-রব্বানীকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ‘সিটিং সার্ভিস’ ও লোকাল দুই ধরনের বাস-মিনিবাস রাখা, ভাড়া ঠিক করে দেওয়া এবং শৃঙ্খলা আনার জন্য ২৬টি সুপারিশ করে। কিন্তু এর কোনোটারই বাস্তবায়ন নেই।

জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, অতীতে সীদ্ধান্তের কমতি নেই, সুপারিশও অনেক হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের মনোযোগেও কমতি নেই। বাস্তবায়নেই মূল সমস্যা। এই সরকার অনেক দিন ক্ষমতায়, তারা পরিপক্ব। তারা সমস্যাটা জানে। সমাধান কী, তা–ও জানা আছে। এখন এমন একটি ব্যবস্থা দরকার, যারা দায়বদ্ধতার সঙ্গে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে অতীতের সিদ্ধান্ত ও সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে। এর জন্য একটি পেশাদারি, শক্তিশালী নিরপেক্ষ ও স্বাধীন একটি ইউনিট গঠন করতে হবে।

About admin

Check Also

‘দ্বিতীয় ইনিংস’ শুরুর ঘোষণা কাদেরের

শে ফিরে নিজ দপ্তরে যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *